Description
স্ত্রী তালাক দিলে দেনমোহর পাবে কি আইন কি বলে দেনমোহর কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয় — এটি একটি সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতীক। এটি নারীকে বিবাহে মর্যাদা দেয় এবং স্বামীকে দায়িত্বশীল হতে শেখায়। ইসলামে নারীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দেনমোহর সেই অধিকারের একটি মৌলিক দিক।
স্ত্রী তালাক দিলে দেনমোহর পাবে কি আইন কি বলে
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের প্রতিটি দিকের সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিবাহ একটি পবিত্র ও সম্মানজনক বন্ধন। এই বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দেনমোহর বা মাহর, যা স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত একটি অধিকার এবং স্বামীর উপর তা পরিশোধ করা ফরজ বা আবশ্যক।
বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, দেনমোহর স্ত্রীর নিশ্চিত অধিকার। বিয়ের সময় যে দেনমোহর নির্ধারিত হয়, তা স্বামী কর্তৃক পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। যদি স্বামী তা পরিশোধ না করেন, তাহলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন ও ১৯৬১ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালার আলোকে, আদালত স্বামীর বিরুদ্ধে রায় প্রদান করে দেনমোহর আদায়ের নির্দেশ দিতে পারে।
আইন অনুযায়ী, দেনমোহর তালাক ছাড়াও স্ত্রী আদায় করতে পারেন এবং এটি ফৌজদারি নয় বরং দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি দাবি হিসেবে গণ্য হয়। আদালতে মামলা করার পূর্বে স্বামীকে আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ পাঠানো যেতে পারে, যা শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির একটি পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হয়।
ব্যারিস্টার-ইফফাত-গিয়াস-আরেফিন। ছবি: সংগৃহীত
তবে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে পারিবারিকভাবে, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, আলেম সমাজ, সালিশ কমিটি বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করার চেষ্টা ইসলাম সম্মত ও সুন্নাহ সম্মত পন্থা।
দেনমোহর হলো সেই অর্থ বা সম্পদ, যা বিয়ের সময় স্বামী তার স্ত্রীকে দেয় বা প্রতিশ্রুতি দেয়। এটি স্ত্রীর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত, এবং তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ইসলামী শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কুরআন এবং হাদিস উভয় জায়গায় দেনমোহরের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে- ‘তোমরা নারীদের দেনমোহর তাদের পূর্ণভাবে প্রদান করো, তা অন্তর থেকে দান স্বরূপ হলেও।’— (সূরা আন-নিসা: ৪)
তালাকের ধরন ও প্রভাব
ইসলামে বিবাহ বিচ্ছেদের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। মূলত তিনটি প্রধান উপায়ে বিবাহবিচ্ছেদ হতে পারে:
তালাক — স্বামীর পক্ষ থেকে দেওয়া বিচ্ছেদ।
খোলা — স্ত্রী বিচ্ছেদ চায় এবং দেনমোহর বা আরও কিছু ফেরত দিয়ে স্বামীকে রাজি করায়।
ফাসখ — কোন যৌক্তিক কারণে আদালত বা ধর্মীয় বিচারকের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা হয়।
স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ হলে দেনমোহর কীভাবে প্রযোজ্য হবে?
যদি স্ত্রী নিজেই বিচ্ছেদের উদ্যোগ নেন — যেমন খোলা, তালাক-এ-তাফওয়ীদ, অথবা ফাসখ, সেক্ষেত্রে স্বামী কি স্ত্রীকে দেনমোহর দিতে বাধ্য থাকবেন?
সহবাস হয়নি কিন্তু বিবাহ সম্পাদিত হলে কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী স্ত্রী অর্ধেক দেনমোহর পাওয়ার অধিকার রাখেন। ‘যদি তোমরা তাদের স্পর্শ না করে থাকো, তবে তাদের জন্য নির্ধারিত মোহরের অর্ধেক রয়েছে।’(সূরা আল-বাকারা: ২৩৭)
সহবাস হয়েছে এমন অবস্থায় স্ত্রী যদি নিজে বিচ্ছেদ চায়, তবুও সম্পূর্ণ দেনমোহর তার প্রাপ্য হয়ে যায়। কেননা, সহবাসের মাধ্যমে বিবাহ সম্পর্ক পূর্ণতা পায় এবং তখন স্ত্রীর দেনমোহরের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্ত্রী খোলা দিলে সে পরিস্থিতিতে, যদি স্ত্রী নিজেই মোহর ফিরিয়ে দিতে বা সেটি মাফ করতে সম্মত হন, তাহলে স্বামী দেনমোহর দিতে বাধ্য থাকেন না। এখানে বিষয়টি পারস্পরিক সমঝোতার উপর নির্ভরশীল। তবে, যদি স্ত্রী দেনমোহর মাফ না করেন, তাহলে দেনমোহর আদায়যোগ্য থাকে।
ফাসখ (আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ), এ ক্ষেত্রে যদি বিচ্ছেদের কারণ স্বামীর দোষ হয় (শারীরিক নিগ্রহ, আর্থিক অবহেলা, ইত্যাদি), তবে স্ত্রী সম্পূর্ণ দেনমোহর পাবেন। কিন্তু যদি বিচ্ছেদ স্ত্রীর কারণে হয় এবং সহবাস না হয়ে থাকে, তাহলে তিনি অর্ধেক দেনমোহর পাবেন।
ইসলামী শরিয়াহ্ অনুযায়ী, স্ত্রী যদি তালাক দেন — সেটা খোলা, তাফওয়ীদ বা ফাসখ যেভাবেই হোক না কেন —তাহলে তিনি সম্পূর্ণ দেনমোহরের অধিকারী। আর যদি সহবাস না হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণভাবে অর্ধেক দেনমোহর প্রাপ্য। দেনমোহর আদায় করা স্ত্রীর হক এবং তা প্রদান করা স্বামীর ফরজ দায়িত্ব। সমাজ ও পরিবারে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এই বিধান যথাযথভাবে পালন করা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


















